
বন্ধু হে!
তারে হালকা গলায় জিগাইলাম, "আচ্ছা, আমার এতো কষ্ট লাগে কেন?"
ছয় শব্দের ছোট্ট একটা প্রশ্ন জিগাইতে গলা কাঁপলো আমার। যেন গলার গহীনে ঘূর্নি পাকাইয়া ছোট্ট একখান ঝড় উঠছিলো। আমি সামলানোর চেষ্টা করলাম। চোখের মইধ্যে জাইগা ওঠা পুকুরখান শান্তই আছিলো। আমি জানি চাইলেও আমি কানতে পারুম না। আমার খালি গলার কাছে জটলা পাকাইয়া বুক ভারী হইয়া যায়। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। তবুও আমি কানতে পারি না। চোখ ঘোলা কইরা ফালানো টলটলে জল টুক কইরা নাইমা আসে না শুধু...
আমার প্রশ্নের উত্তর সে দিলো না।
এইযে এতো ভালোবাইসা দুইটা মানুষ একটা বাসা বাঁধতে পারে না, লোক দেখাইয়া দুইটা হাত মুঠায় নিয়া ঘুরতে পারে না, একলগে বৃষ্টিতে ভিজতে পারে না, জ্বর বাঁধাইয়া দেখাশুনায় পাশাপাশি কাটাইতে পারে না, দুই কাপ রং চা নিয়া আলাপ দিতে দিতে সন্ধ্যা মিলাইতে পারে না, রাইত বিরাইতে একটা ছোট্ট স্ক্রিন ভাগাভাগি কইরা একটা সিনেমা দেখতে পারে না, মাঝরাইতে বারান্দায় দাঁড়াইয়া একটা সিগারেট ধরাইতে পারে না, ঝগড়া কইরা-গাল ফুলাইয়া দুইবেলা একলগে খাওয়া বন্ধ করতে পারে না, ছাইড়া আসার হুমকি দিতে পারে না, ক্লান্তি নিয়া একজন আরেকজনরে জড়াইয়া ধইরা শান্তির একটা ঘুম দিতে পারে না, সকালে দুইটা প্রিয় মুখ দেখাদেখি কইরা দিন শুরু করতে পারে না- ও আরো অন্যান্য......
এতোসব না পারাগুলা দুঃখ হইয়া সুঁচ ফুটায় না কন? কষ্ট হয় না তখন?
আমার তো হয়, ম্যালা ম্যালা কষ্ট হয়।
এই মানুষটা কয় না কেন? আমি তো ভাবি না 'ব্যাটা মাইনষের মন খারাপ হয় না/ব্যাটা মাইনষের কষ্ট হয় না'। সে তো তা জানে। আমার কাছে তাইলে লজ্জা কিয়ের? নাকি তার আসলে দুঃখই হয় না আমার মতোন!!
আমি ভাবলাম মানুষটা তো নিজেরই। আগের এক প্রশ্নের উত্তর দেয় নাই, তো কী হইছে? মনে চাইপা না রাইখা আরেক প্রশ্ন জিগাইয়া ফেললাম। আবারও হালকা গলায় কইলাম "আচ্ছা, তোমার কি দুঃখ হয় না? আমারে যে পাইলা না, তোমার কি একটুও দুঃখ হয় না?"
আবারও একইরকম গলা কাঁপল আমার। আমিও কাঁপলাম দুঃখের তোড়ে। শুধু টলটল করা চোখ দুইটা বাইয়া একফোঁটা জল নামলো না। কারণ, ম্যালা কষ্ট হইলেও আমি কানতে পারি না।
সে আমার হাত দুইটা টাইনা তার হাতের উপর রাখলো। চোখ জোড়া নামাইয়া আনলো আমার চোখ বরাবর। তার চোখ লাল। কিন্তু ম্যালা শান্ত। কেমন বিহ্বল লাগলো তারে! আমি জড়বস্তুর মতোন স্থির হইয়া গেলাম।
সে কইলো "এইযে নিজেরে খুব বুনোফুল কইয়া বেড়াও, আমার কাছে তোমারে কী লাগে জানো? পাতা, একটা হলুদ পাতা। এই পাতার উপর ঈশ্বর আলপনা কইরা দিছেন সমস্ত প্রকৃতি। সৃষ্টি, ধ্বংস, স্নিগ্ধতা, ক্ষিপ্ততা, রং- সব পাই এইখানে। আমি পাতাখান যত্নে আগলাইয়া রাখলাম বুকের মইধ্যে। খেয়াল কইরা দেখলাম তোমার পরে আমার আর ভালোবাসা হইলো না। তোমারে পাইলাম কী পাইলাম না, সেই হিসাবও আর করতে পারি না। আমি খালি জানি, তোমার পর আমারে আর কেউ পাইলো না। আমি আর মেঘের মইধ্যে মেঘ হই না। ঘাসের মইধ্যে ঘাস হই না। আমি একটা দাঁড়কাক হইয়া একটা জমিতে স্থির হইয়া গেলাম। আমি যত্নে সরাইয়া রাখলাম না পূরণ হওয়া ব্যাবাক আশ, এখন খালি আমার বুকের মইধ্যে একটা হলুদ পাতার দীর্ঘশ্বাস.... "
সে পত্তেকবারই এমন সুন্দর কইরা কথা কয়। হুদাই কী আর মানুষটার প্রেমে পড়ছি!! এইগুলা লোক ভুলানো মিষ্টি কথা না। আমি জানি মিথ্যা বলে নাই সে। আমি জানি আমারে ম্যালা ভালোবাসে সে। আমি জানি আমার জন্য ম্যালা কষ্ট হয় তার।
তার বলার মইধ্যে শুধু শুনলাম না তারে। চাইয়া থাইকা দেখলাম তার কাঁইপ্যা ওঠা ঠোঁট। ঠিকরাইয়া নাইমা আসা চোখের জল। ফুইলা ফুইলা ওঠা লাল নাক। একটা মানুষ কানলেও কেন তারে এমন অপার্থিব সুন্দর লাগতে হইবো! আমি মনে মনে প্রমাদ গুনলাম। সামলাইলাম নিজেরে। আমি তো কানতে পারি না। খেয়াল করলাম একফোঁটা উষ্ণ জল কোত্থেইকা নাইমা আসছে ঠোঁটের কাছে। জলের স্বাদটা নোনতা। সেইদিকে বেশি মনোযোগ দিলাম না আমি। তার হাত দুইটা শক্ত কইরা ধইরা কইলাম "সন্ধ্যা মিলাইতে এখনও ম্যালা বাকি, তুমি আমার পাশে বন্ধু, একটু বসিয়া থাকো......"

